আমাদের বাড়ির আশেপাশে যা ঘটেছিল - একটা সত্যি অভিজ্ঞতা
আমি অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম এই ঘটনাগুলো লিখব কিনা। কারণ এগুলো একটা দুইটা না, অনেকগুলো ঘটনা, আর প্রত্যেকটাই আমার নিজের পরিবারের সাথে জড়িয়ে আছে। লিখতে বসেও কেমন যেন গা ছমছম করছে, তাও লিখছি।
শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। ওই বছর সারা বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল, সেটা তো অনেকেই জানেন। আমাদের এলাকাতেও জল ঢুকে যাচ্ছিল, তাই আব্বু দরজার নিচে ইট বসিয়ে দিচ্ছিলেন যেন জল ভিতরে না আসে।
তখনকার দিনে মাল্টিপ্লাগ বলতে যেগুলো ছিল, সেগুলোর নিচের দিকে রড বা স্ক্রু বেড়িয়ে থাকত। আব্বু ফ্যান দিয়ে বাতাস করে ইটটা তাড়াতাড়ি শুকানোর চেষ্টা করছিলেন। কেন যেন হঠাৎ মাল্টিপ্লাগের নিচে হাত দিয়ে ফেলেন।
আর সাথে সাথে প্রচণ্ড একটা কারেন্টের শক লাগে। শকটা এতটাই জোরে লাগে যে আব্বু দশ-বারো হাত পিছনে ছিটকে যান। ওই দিনের অবস্থাটা যে কী হয়েছিল, কারেন্টের শক খেলে যেমন হয় আর কি, সবাই মোটামুটি আন্দাজ করতে পারবেন।
এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই, বন্যা শেষ হওয়ার পর, আমরা আমাদের মামার বাড়িতে যাই। মামার বাড়ি ছিল উত্তরার প্রেমবাগানে। তখনকার উত্তরা এখনকার মতো ছিল না, অনেক জঙ্গল, অনেক গাছপালা, ফাঁকা ফাঁকা।
মামার বাড়িটাও ছিল সেরকমই, বড়, আর আশেপাশে ঝোপঝাড়। আমরা আগে থেকেই আশেপাশের লোকজনের মুখে শুনেছিলাম যে মামার বাড়িতে সন্ধ্যার পর কেউ বাইরে বের হয় না। বলত বাড়ির পিছনে নাকি কিছু একটা আছে। ছোট ছিলাম তখন, ঠিক বুঝতাম না ব্যাপারটা কী।
একদিন হঠাৎ টিনের চালের উপর কিছু একটা পড়ার শব্দ পাওয়া গেল। মামার বাড়ির পিছনে একটা আমগাছ ছিল, ঘর থেকে দূরত্ব মোটামুটি বিশ-ত্রিশ ফিট হবে। এতদূর থেকে আম উড়ে এসে টিনের চালে পড়া, এটা স্বাভাবিকভাবে সম্ভব না।
তারপর জানালার চিপা দিয়ে কী যেন একটা ফুটফুট শব্দ করে টিনের চাল দিয়ে ধুপধুপ করে চলে যেত। মা তখন আমাদের কিছু বলতেন না। বাড়ি ফিরে বলতেন যে মামার বাড়ির পিছনে নাকি তিনটা জিন থাকে।
৯৮ শেষ হলো। ৯৯ এর দিকে আরেকটা ঘটনা ঘটে। আমাদের বাড়ির পাশে এক বড় ভাই থাকতেন, উনি সন্ধ্যার সময় খেলাধুলা শেষ করে সবার শেষে বাড়ি ঢুকতেন, আস্তে ধীরে গুছিয়ে।
সেদিনও তাই হচ্ছিল। আমাদের বাড়ির পাশেই একটা কামরাঙ্গা গাছ ছিল, পিছনে জঙ্গলের মতো জায়গা। গাছের গোড়ায় উনি দেখলেন একটা ছোট্ট বাচ্চা বসে আছে।
উনি ভাবলেন পরিচিত কেউ হবে হয়তো। "কিরে, তুই এখানে বসে কী করছিস" বলে হাত দিলেন গায়ে। বাচ্চাটা মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। আর তাকানোর পরপরই উনি একদম সেন্সলেস হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন।
ধুপ করে পড়ার শব্দ শুনে আশেপাশের লোকজন দৌড়ে আসে, বাড়িতে নিয়ে যায়। জ্ঞান ফেরার পর জিজ্ঞেস করা হলে উনি বলেন বাচ্চাটার চেহারা একদম বিদঘুটে ছিল, চোখগুলো লাল, যেন এটা কোনো মানুষের বাচ্চা নয়। এমন বাচ্চা আশেপাশে কখনো দেখা যায়নি।
এই ঘটনার পর থেকে ওই বড় ভাইয়ের মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেত। রাত বারোটা একটার দিকে কারেন্ট চলে গেলে (তখন প্রায়ই লোডশেডিং হতো), উনি একা একা বাঁশি বাজাতেন। কোনো কারণ ছাড়াই, রাত দুপুরে।
এখন পিছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, এই সবগুলো ঘটনা যেন একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছে। কিছু একটা আছে, যেটা বারবার, আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল বলে মনে হয়।
২০০০ সালে যা ঘটল সেটাই সবচেয়ে বেশি মনে গেঁথে আছে। আব্বু ৯৮ এর শক খাওয়ার পর থেকে ব্রেইনে একরকম সমস্যা দেখা দিয়েছিল। আমরা ঢাকার বড় বড় হাসপাতালে দেখাই, ডাক্তাররা কোনো সমাধান দিতে পারেননি।
কোনো উপায় না পেয়ে আমরা গ্রামের দিকের এক কবিরাজের কাছে যাই। কবিরাজ একটা দিন ঠিক করে দিলেন, এশার নামাজের পর পর আসতে বললেন। আমরা সেভাবেই যাই।
রুমের ভিতর ঢুকে যা দেখলাম তা এখনো চোখে ভাসে। রুমের মাঝখানে একটা বড় বলের ভিতর গোলাপ ফুলের পাপড়ি ছড়ানো, চারপাশে মোমবাতি জ্বলছে, আর আশেপাশে নানারকম ফল রাখা।
কবিরাজ বললেন, "কোনো ভয় পাবেন না, চুপচাপ থাকবেন। ভয় পেলে বা অন্যরকম কিছু করলে যে আসতে চাইছে সে আর আসবে না।"
তারপর হঠাৎ করে রুমের লাইট নিভিয়ে দিলেন। উনি ধ্যানে বসলেন। আর কিছুক্ষণ পরেই একটা ধুপ শব্দ, মোমবাতিগুলো একসাথে সব নিভে গেল।
পুরো রুমটা কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে গেল। হতে পারে ওটা মোম নেভার ধোঁয়াই ছিল, সঠিক জানি না। কিন্তু কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছিল।
তারপর আসল ব্যাপারটা। একটা ভারী গলায় সালাম এলো, "আসসালামু আলাইকুম।" ঠিক কোন দিক থেকে এলো বলতে পারব না। আমি তখন অনেক ছোট, ভয়ে জমে গিয়েছিলাম পুরোপুরি।
ঠিক তখনই কবিরাজের স্ত্রী হঠাৎ উঠে লাইট জ্বালিয়ে দিলেন। বললেন, "আপনারা কিছু একটা করেছেন, তাই সে এসে আবার চলে গেছে।" আমরা কী করেছিলাম, সেটা এখনও আমার কাছে পরিষ্কার না।
কবিরাজের দিকে তাকিয়ে দেখি উনি ঘামছেন প্রচণ্ড রকম, মাথায় গামছা পেঁচানো। ঘেমে একদম ভিজে গেছেন। ওইদিন এভাবেই ঘটনাটা শেষ হয়।
কবিরাজ বললেন এটা আর ফিরে আসবে না, কিন্তু তার আগে "একটা খবর" দিয়ে গেছে বলে জানালেন। কী খবর, সেটা তখন বলেননি। শুধু বললেন কয়দিন পর জানাবেন।
কয়দিন পর কবিরাজ আমাদের বাসায় এলেন। সোজা বাসার ভিতরে ঢুকে একটা বাটিতে সরিষার তেল, রসুন, আরও কী কী যেন মিশিয়ে কিছু একটা দোয়া পড়লেন, ঠিক কী পড়েছিলেন সেটা জানি না।
হঠাৎ করেই তিনি ফুল ফোর্সে বিল্ডিং থেকে বের হয়ে গেলেন। যেন কেউ তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
পুরো বাড়িটা তিনি ঘুরলেন, বাউন্ডারির চারটা কোনায় গিয়ে থামলেন প্রতিবার। জানালা খোলা ছিল, সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় জালানার আঘাতে তার হাত কেটে গিয়েছিল, তবু তিনি থামেননি।
শেষে আবার মাঝখানে ফিরে এসে হঠাৎ একদম সেন্সলেস হয়ে পড়ে গেলেন। আমরা জল-টল দিয়ে জ্ঞান ফেরালাম। জ্ঞান ফেরার পর তার স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে আবার বাউন্ডারির চারটা কোনায় গেলেন।
আর সেই চারটা কোনা থেকে বের করলেন চারটা তাবিজ। আমরা তখন হতভম্ব, কারণ আমাদের তো কোনো শত্রু ছিল না বলেই জানতাম। কে বা কেন এই তাবিজ পুঁতে রাখল, সেটা আজও অজানা।
কবিরাজেরও তো কোনো আলাদা কোনো শক্তি ছিল না যে নিজে থেকে জানবেন কোথায় তাবিজ পোঁতা আছে। আর বাসার বাইরের কেউ এসে এভাবে চারটা কোনায় তাবিজ পোঁতাটাও সহজ ব্যাপার না, কারণ বাসার নিরাপত্তা তখনও যথেষ্ট ছিল।
তাবিজ বের করার পর থেকে এইসব ঘটনাগুলো আর হয়নি, এটা সত্যি। কিন্তু ওই বাচ্চাটা, ওই সালামের গলা, ওই আম পড়ার শব্দ - এগুলোর কোনো ব্যাখ্যা আজও আমাদের কাছে নেই। শুধু জানি এই সবগুলো ঘটনা কোনো না কোনোভাবে একসাথে জড়িয়ে ছিল।
আপনাদের কারো সাথে কি এরকম কিছু ঘটেছে? কমেন্টে জানাবেন, সত্যিই জানতে চাই।
